নারীর জীবন: বাইরে মহামারি, ঘরে নির্যাতনকারী “হিরো আলম”

0
385

নারীর জীবন: বাইরে মহামারি, ঘরে নির্যাতনকারী “হিরো আলম

সেদিন যখন পত্রিকায় দেখলাম করোনাভাইরাস মহামারিতে সারাবিশ্বের মানুষ শুধু বেঁচে থাকা নিয়ে আতঙ্কিত, এই পরিস্থিতিতেও চলছে নারীর ওপর সীমাহীন বর্বর নির্যাতন। সারাবিশ্বে পারিবারিক সহিংসতা অনেক বেড়ে গেছে এবং চরম অনিরাপত্তায় ভুগছে নারীরা। বিশ্বব্যাপী এই লকডাউন পরিস্থিতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে গৃহে আবদ্ধ থাকা নারীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন। গৃহে শিশুকে নিপীড়ন করা আরও সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ শিশু ভয়ে কাউকে কিছু বলে না, কী করতে হবে শিশু বুঝে না, কার কাছে যেতে হবে জানে না। এবং সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার, শিশুর কথা কেউ বিশ্বাসও করে না।
এই নির্যাতনের মাত্রা এতটাই বেশি যে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস গত ৬ এপ্রিল এই বিষয়ে এক বিবৃতি দিতে বাধ্য হন। তিনি বলেছেন, করোনা পরিস্থিতিতে নিজের ঘরে সবচেয়ে নিরাপদে থাকার কথা ছিল নারীদের। অথচ পারিবারিক নির্যাতন এমন আকার ধারণ করেছে যে অনেক নারীর কাছে ঘর এখন নরকের মতো হয়ে উঠেছে। এটা খুবই দুঃখজনক এবং হতাশার।
প্রশ্ন উঠতে পারে কেন পুরুষরা ঘরে আবদ্ধ নারীর ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলো? যারা নির্যাতনকারী তাদের কাছে পরিস্থিতি কোনও ব্যাপার নয় এটা যেন ছেলেখেলা। ব্যাপার হচ্ছে নারী বা শিশু, যাদের সে নির্যাতন করবে, তারা কতটা হাতের কাছে রয়েছে। গৃহবন্দিত্বকালের এই সময়ে নারী দীর্ঘ সময় তার অত্যাচারীর কাছাকাছি থাকে। তারা চাইলেই বাসা থেকে বের হয়ে যেতে পারছেন না, পারছেন না কারও কাছে গিয়ে সাহায্য চাইতে। এসময়টাতে পুলিশ, হাসপাতাল সবাই মহামারী করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যস্ত। আইন বিষয়ে সহায়তাকারী বিভিন্ন সংস্থাও বন্ধ বা কম কাজ করছে। নির্যাতিত হওয়ার পর অভিযোগ জানানোর কোনও উপায়ই নারীর হাতের কাছে খোলা থাকে থাকছে না এতে অসহায়ের মতো দিন কাটাচ্ছে নারী ও শিশুরা।

এছাড়া এইসময় ঘরে আবদ্ধ পুরুষ অর্থনৈতিক, সামাজিক, চাকরি হারানোর ভয়, ভাইরাস সংক্রমণ ইত্যাদি নানা কারণে হতাশাগ্রস্ত, চিন্তিত এবং মানসিকভাবে ভেঙে বেশির ভাগ পুরুষ। তাদের এই নিরাপত্তাহীনতার সকল চাপ ও ক্ষোভ তারা উগড়ে দিচ্ছে তার পাশে থাকা নারী ও শিশুর ওপর তাদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে যৌন নির্যাতন। কারণ এটাই সবচেয়ে সহজ উপায় নিজেকে হালকা করার এবং মনকে প্রফুল্ল করার।

সিলেট এমসি কলেজের জঘন্যতম গণধর্ষণের শিকার এক নারীর পরপরই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে রাতের আঁধারে ঘরে ঢুকে এক নারীকে (৩৭) সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর ঘটনায় ইতিমধ্যেই প্রধান আসামি চার জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

এই ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে গতকাল রাত পৌনে ১২টায় বেগমগঞ্জ থানায় দুটি মামলা দায়ের করেছেন। একটি মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এবং অন্যটি পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে। দুই মামলাতেই নয় জনকে আসামি করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার চার জন হলেন— বেগমগঞ্জ একলাশপুর এলাকার রহমত উল্যার ছেলে ও মামলার প্রধান আসামি বাদল (২২), দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার, রহমত উল্লাহ ও আবদুর রহিম (২২)।

এদের মধ্যে আজ সোমবার ভোরে অভিযান চালিয়ে বাদলকে ঢাকা থেকে ও দেলোয়ারকে অস্ত্রসহ নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাবের বিশেষ দল। বিষয়টি ডেইলি সিলেট ২৪ ডটকম কে নিশ্চিত করেছেন র‌্যাব-১১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম। তিনি বলেন, ‘গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইল এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করার সময় একটি পরিবহন থেকে দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ারকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঢাকার কামরাঙ্গীর চর থেকে প্রধান আসামি বাদলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদেরকে বেগমগঞ্জ থানায় পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।’

আর গতকাল বেগমগঞ্জ থেকে আবদুর রহিম ও রহমত উল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি দ্য ডেইলি স্টারকে নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জের বেগমগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাজাহান শেখ ও বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুনুর রশিদ চৌধুরী।

গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের বড় খালপাড় এলাকায় ঘরে ঢুকে ওই নারীকে অপবাদ দিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেছে একদল তরুণ। সেসময় ঘটনার ভিডিওচিত্র ধারণ করেন তারা। ঘটনার এক মাস দুই দিন পর গতকাল দুপুরে ভুক্তভোগী নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নে ঘরে ঢুকে ওই নারীর স্বামীকে অন্য কক্ষে বেঁধে রেখে আসামিরা তাকে নির্যাতন করেন। তারা এ ঘটনার ভিডিওচিত্রও ধারণ করেন। গত এক মাস ধরে তারা এ ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগী নারীকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তারা ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একলাশপুর ইউনিয়নের অনন্তপুর ও জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের একাধিক ব্যক্তি গতকাল জানান, ওই নারীর বিয়ে হয় বছর তিনেক আগে। স্বামী তাকে রেখে অন্যত্র দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দীর্ঘদিন তার সঙ্গে স্বামীর কোনো যোগাযোগ ছিল না। গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে স্বামী ওই নারীর ঘরে ঢুকেন। স্থানীয় মাদক চোরাকারবারি বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার এ ঘটনা দেখে তার লোকজন নিয়ে রাত ১০টার দিকে ওই ঘরে প্রবেশ করে নারীকে অপবাদ দিয়ে তাকে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে তাকে পিটিয়ে বিবস্ত্র করে তার ভিডিও ধারণ করেন।

ওই ভিডিও ফুটেজ দেখে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার ধিক্কার জানিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

গতকাল স্থানীয় ইউনিয়ন পিরিষদের চেয়ারম্যানপ্রার্থী সাইদুর রহমান দিপু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মাদক চোরাকারবারি দেলোয়ার বাহিনী এই ঘটনা ঘটিয়েছে।’ তিনি নির্যাতনকারী দেলোয়ার ও তার বাহিনীর লোকজনের গ্রেপ্তার দাবি করে বলেন, ‘কোনো সভ্যসমাজে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে না।’

স্থানীয় একলাশপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগ গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারী আমার কাছে এসেছিলেন। তবে কারা তাকে নির্যাতন করেছেন, তা তিনি বলেননি। ঘটনার পর থেকে তিনি ও তার পরিবার বাড়িতে বসবাস করে না।’

হিরো আলম আজ তার নিজস্ব ফেসবুক পেজ থেকে লাইভে হয়েছে তীব্র ক্ষোভ নিন্দা প্রকাশ করেন, তিনি বলেন, আপৎকালীন সময়ে অপরাধীরা মানুষের এই দুর্বলতা, অমনোযোগিতা এবং ঘরবন্দি হওয়ার পরিস্থিতিকে কাজে লাগায়। দুঃসময়ে গৃহ একজন নারী বা শিশুর কাছে সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা। কিন্তু মহামারির সময়কার এই সামাজিক দূরত্বকে পুঁজি করে নারীর ওপর অত্যাচারের হার বাড়িয়ে দিয়েছে, তারই পাশে থাকা পুরুষ।
বাংলাদেশে অধিকাংশ পারিবারিক সহিংসতার ঘটনার কোনও রিপোর্টই হয় না। কারণ পারিবারিক সহিংসতা এমন একটি ঘটনা, যা ঘটিয়ে থাকে পরিবারে থাকা কাছের মানুষ, পাশের মানুষ। যারা নীরবে নিয়মিত অত্যাচার করে কিন্তু সমাজের ভয়ে এসব অত্যাচারের অধিকাংশ কাহিনি বাইরে প্রকাশিত হয় না। পারিবারিক সহিংসতা হতে পারে মানসিক, শারীরিক, যৌন এবং অর্থনৈতিক। লকডাউনের কারণে বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতার যে ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়টি নজরে আনার ব্যাপারে এখনও তেমন কোনও জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলেই যতদূর জানি। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা জেলখানা, যেখানে অবরুদ্ধ নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন করছে পরিবারের শক্তিশালী ব্যক্তি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মার্চ মাসে প্রকাশিত একাধিক রিপোর্ট ও সমীক্ষা বলছে, করোনার কারণে ঘরবন্দি বহু দেশেই পারিবারিক সহিংসতার ছবিটা একইরকম। ভারতের লকডাউনের সময় নারী নির্যাতনের ঘটনা উত্তরোত্তর বাড়ছে। গত ২৩ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত জাতীয় মহিলা কমিশনে শুধুমাত্র ইমেইল মারফত ৫৮টি পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ জমা পড়েছে। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন অল ইন্ডিয়া প্রগ্রেসিভ উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কবিতা কৃষ্ণণ। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যারা যোগাযোগ করেছেন তাদের প্রত্যেকেই একটা কথা বলেছেন, লকডাউন ঘোষণা হবে জানলে সময় থাকতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসতেন তারা। লকডাউনের জেরে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে।’

‘ হোম কোয়ারেন্টিন চলাকালে নারী হত্যাও বন্ধ হয়নি, থামেনি পুরুষদের ক্রোধ। এজন্যই জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা আর্জেন্টিনায় একটি জরুরি ইস্যু’ কথাগুলো বলেছেন সেখানকার নারীবাদী নিউনা মেনস। গত ২০ মার্চ শুরু হওয়া এই হোম কোয়ারেন্টিনে বুয়েন্স আয়ার্সে ছয় জন নারী নিহত হয়েছে। সাংঘর্ষিক অবস্থায় লকডাউনে থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করে নাউ দ্যাট দে সি আস নামের একটি মানবাধিকার গ্রুপ। তারা জানিয়েছে, মার্চেই নিহত হয়েছেন ২৪ জন, অর্থাৎ প্রতি ২৯ ঘণ্টায় ১ জন।

পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীর জন্য কোনও দেশই নিরাপদ নয়। হোম কোয়ারেন্টিন তাদের নির্যাতনকারীর একেবারে কাছাকাছি নিয়ে গেছে। শুধু ভয়ংকর ভাইরাস নয়, এই অবস্থা নারীকে এমন এক পৃথিবীর কাছে নিয়ে গেছে, যেখানে অধিকাংশ দরজাই তার জন্য বন্ধ।

বিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলনকর্মীরা বলছেন যে পারিবারিক সহিংসতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে চারিদিকে। যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়। সেখানে জাতীয় পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ক হটলাইনে ১০ থেকে ২৪ মার্চের ভেতর অসংখ্য ফোন এসেছে। নির্যাতিতারা বলছেন নির্যাতনকারীরা তাদের বাড়ি ছেড়েও যেতে দিচ্ছে না, আবার অত্যাচারও চালিয়ে যাচ্ছে। ভিকটিমকে সহযোগিতাকারী নিউইয়র্ক ভিত্তিক প্রোগ্রাম সেইফ হরাইজন বলেছে, পরিবারিক সহিংসতার শিকার মেয়েরা কখনও ফোনই ধরতে পারে না। আমেরিকাতে চ্যাট সার্ভিস ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে ভিকটিমদের জন্য।

১৭ মার্চ থেকে লকডাউনে রয়েছে ফ্রান্স। তার ১১ দিন পরে সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ফ্রান্সে পারিবারিক নির্যাতন ৩০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। রাজধানী প্যারিসে পরিসংখ্যানটা আরও বেশি, ৩৬ শতাংশ। ফরাসি সরকার ভিকটিমদের বলেছে সরাসরি ফার্মেসিতে সাহায্য চাইতে। ফার্মেসি পুলিশকে জানাবে।

ফরাসি অভ্যন্তরীণ (ইনটেরিয়র) মন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ১৭ মার্চ কোয়ারেন্টিন শুরু হওয়ার পর পারিবারিক সহিংসতার হার বেড়েছে। জাতীয়ভাবে পুলিশের ইন্টারভেনশন বেড়েছে ৩২ ভাগ। অনেক হোটেল রুম কম টাকায় দেওয়ার ব্যবস্থা করা হ

স্থানীয় একলাশপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগ গতকাল dailysylhettoday24.com বলেন, ‘ঘটনার পর ভুক্তভোগ

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে